Home » Breaking News » আজ বার্মার স্বাধীনতা দিবস : মুসলমানদের হাত ধরেই স্বাধীনতা আসলেও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি রোহিঙ্গারা

আজ বার্মার স্বাধীনতা দিবস : মুসলমানদের হাত ধরেই স্বাধীনতা আসলেও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি রোহিঙ্গারা

হাসান হাফিজ, আরাকান টিভি :

আজ ৪ঠা জানুয়ারী উপমহাদেশের আলোচিত-সমালোচিত রাষ্ট্র বার্মার স্বাধীনতা দিবস । ১৯৪৮ সালের এ দিনে বৃটিশদের কাছ থেকে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে । বিশ্ব মানচিত্রে ইউনিয়ন অব বার্মা নামে আলাদা একটি ভূ-খন্ড পায় আমরা । পেয়েছি একটি স্বাধীন পতাকা ।

চল্লিশের দশকের পর থেকে মুসলমানরা বৃটেনের শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা চালায় । পাকিস্তান ও ভারতের জন্মের পর মুসলমানদের হাত ধরেই বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে । স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম তিন নেতার ২ জনই ছিল মুসলিম । বার্মা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রশিদ এবং  বার্মা মুসলিম লীগ সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক । অপরজন অংসান ( সু চি’র পিতা ) ছিলেন বুদ্ধিস্ট । আব্দু রাজ্জাক বার্মিজ মুসলিম হলেও, আব্দু রশিদ ছিলেন খাঁটি রোহিঙ্গা মুসলমান । তিনি স্বাধীন বার্মার সংবিধানের খসড়া প্রণয়নকারী । মুসলমানের অগ্রণীয় ভূমিকায় বার্মা স্বাধীনতা লাভ করলেও, আজ সে স্বাধীন বার্মায় পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি মুসলমানরা । বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে যুগ যুগ ধরে  বিমাতাসূলভ আচরণ করে যাচ্ছে বৌদ্ধ সরকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ মিলিশিয়ারা ।

স্বাধীনতা সংগ্রামের তিন সিংহ পুরুষ বার্মা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন সভাপতি আব্দু রশিদ (মাঝে পায়ের উপর পা তুলে বসা ), তার ডান পাশে অংসান ( সু চি’র পিতা ), বাম পাশে বার্মা মুসলিম লীগ সভাপতি আব্দু রাজ্জাক । ছবিটি ১৯৩৬ সালে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে তোলা ।

২ লক্ষ ৬১ হাজার ৯৭০ বর্গমাইল আয়তনে বসবাসকারী  বার্মার ৬ কোটি মানুষের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জনগোষ্ঠী হচ্ছে মুসলমান। ৮০ লক্ষাধিক মুসলমানের এক তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা মুসলমান ছিল । ১৯৪৮ সালে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকানকে  বার্মা স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে। কিন্তু ১৯৬২ সালে ১ ডিক্রি বলে জেনারেল নে-উইনের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা সরকার আরাকানের স্বায়ত্ত শাসন প্রত্যাহার করে। এবং জেনারেল নে-উইন রোহিঙ্গা মুসলমানদের বহিরাগত হিসেবে গণ্য করে এবং তাদেরকে শুধু দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণতই করেনি, মুসলমানদের উপর অত্যচার-নির্যাতন বৃদ্ধি করে, যাতে মুসলমানরা আরাকান ত্যাগ করতে বাধ্য হয় । ১৯৮২ সালে জান্তা সরকার নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন এনে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয় । পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা সব সরকার রোহিঙ্গাদের সাথে বৈষম্যনীতি প্রয়োগ করে জাতিগত দমন পীড়ন অব্যাহত রাখে ।

ব্রিটিশরা বার্মাকে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কাগজে কলমে লিখে দিচ্ছেন

বার্মার  ৭০ বছরের স্বাধীনতা রোহিঙ্গাদের উপহার দিয়েছে শুধু মা-বোনদের ধর্ষণ, রক্তপাত আর লাশের মিছিল। স্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক নিদারুণ বৈষম্য, বঞ্চনা, হাহাকার, নিষ্ঠুরতা আর দানবীয় হিংস্রতা হয়েছে তাদের নিত্যসঙ্গী। বৌদ্ধ জান্তারা শুধু নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। আজ তাদের নাম নিশানা পর্যন্ত চিরতরে বার্মা মাটি থেকে মুছে ফেলার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী লিপ্ত হয়েছে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে। বিশ্ব বিবেককে পরোয়া না করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি। তাদের এই তাণ্ডব থেকে ফসলের ক্ষেতও রেহাই পাচ্ছে না। শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয় তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে বার্মার উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের। তারা তলোয়ার হাতে যাকেই সামনে পাচ্ছে নারী শিশু সবাইকে কেটে টুকরা টুকরা করছে। আগুনে নিক্ষেপ করছে জীবন্ত রোহিঙ্গাদের। 
১২ শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে আরাকানে বসবাসকারী উন্নত শির একটি জাতি আজ সর্বস্ব হারিয়ে পরদেশে উদ্বাস্তু। স্বাধীনতা যেকোনো জাতির কপালে এমন দুর্যোগ ডেকে আনে তা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। হাজার বছরের গৌরবময় রোহিঙ্গা জাতি আজ স্বাধীন বার্মার  পৃথিবীর সবচেয়ে নিগৃহীত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। 

বার্মা প্রশাসনের জাতিগত নিধনের মুখে মাতৃর্ভূমি ত্যাগ করে রোহিঙ্গারা পালিয়ে যাচ্ছে

যাদের হাত ধরে বার্মার স্বাধীনতা এসেছে আজ সে রোহিঙ্গারা ওই ১৩৫টি বুনিয়াদি জাতির তালিকায় নেই। রোহিঙ্গাদের বাদ দেয়া হয়েছে সমস্ত সরকারি চাকরি থেকে। এমনকি বার্মার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অধিকার নেই তাদের। নিজ নিজ গ্রামেরও বাইরে যেতে পারে না রোহিঙ্গারা। বিয়ে করতে পারে না সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া। বিয়ের অনুমতি পাওয়া খুবই কঠিন। সরকারি ফির পাশাপাশি দিতে হয় ঘুষ। আবেদন করলে বছরের পর বছর পড়ে থাকে ফাইল। ফলে সরকারি অনুমোদন না নিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে বিয়ে করলেও সন্তান নিতে পারে না তারা। সন্তান নিলেও সন্তানের পরিচয় দিতে হয় অন্য কোনো দম্পতির নামে। এমনকি দাদা দাদীকে বাবা-মা বলে পরিচয় দিতে হয় অনেক সন্তানকে। বিয়ের জন্য সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যারা অনুমতি পায় তাদের শর্ত দেয়া হয় দু’টির বেশি সন্তান নিতে পারবে না তারা। রোহিঙ্গা শিশুদের জন্ম নিবন্ধন করা হয় না। বার্মা সরকারের আশঙ্কা রোহিঙ্গারা সংখ্যায় বেড়ে গেলে বৌদ্ধরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে আরাকানে। সে কারণে তাদের ওপর আগে থেকেই চালু থাকা এ নীতি ২০১৩ সালে কঠোর আকারে প্রয়োগ করা হয়। 

রোহিঙ্গাদের নিজ রাজ্য বা নিজ গ্রামের বাইরে স্বাধীনভাবে চলাচলের কোনো অনুমতি নেই। নিজ এলাকার বাইরে গেলে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে হয়। অনিয়ম ছাড়া মেলে না এ ট্রাভেল পাস। কেউ গুরুতর অসুস্থ হলেও হাসপাতালে নেয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ে তাদের জন্য। তা ছাড়া তাদের জন্য নেই চিকিৎসার ভালো কোনো ব্যবস্থা। ২০০১ সালে রোহিঙ্গাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু মাত্র গ্রামে বিদ্যমান সীমিত কিছু স্কুলেই তারা পড়ালেখা করতে পারে। তাদের শিক্ষার হার খুবই সামান্য। ২০ ভাগের বেশি নয়। 
এভাবে স্বাধীন বার্মাতে ক্রমে ক্রমে সব কিছু কেড়ে নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিঃস্ব করতে করতে আজ অসহায় এ জাতিকে সম্পূর্ণরূপে নিধনের কাজে নেমেছে সরকার। 

১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হওয়ার পর আরাকানীদের জীবনে যে কালো অধ্যায় নেমে আসে তা বার্মার স্বাধীনতা পূর্বকালে আরাকানীদের ওপর বর্মি রাজাদের কয়েক শ’ বছরের নিষ্ঠুরতাও হার মানে। হাজার বছরের সমৃদ্ধ একটি জাতি আজ তাই প্রাণ রক্ষার জন্য স্বাধীন বার্মা ছেড়ে পরদেশে আশ্রয়প্রার্থী। দুর্ভাগ্য রোহিঙ্গাদের ললাট লেখন। স্বাধীনতা দিবস পালন করতে গিয়ে হয়তোবা আজ আব্দু রশিদ, আব্দু রাজ্জাক ও অংসানের গুণগান করবে বর্মী জাতি । কিন্তু এড়িয়ে যাবে আব্দু রশিদের রোহিঙ্গা জাতিগত পরিচয় ।

আরো দেখুন

বার্মিজ সেনাপ্রধানের বিচারের দাবি ব্রিটিশ এমপিদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরাকান টিভি :  রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে বার্মার সেনাপ্রধানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি করার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *