Home » Breaking News » রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন অপরিপক্ব ও ভয়াবহ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন অপরিপক্ব ও ভয়াবহ

লেখক : ম্যাথিউ স্মিথ

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকার এখনও বলছে, হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে তাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানো শুরু হবে যেকোনো দিন। রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালানোর মাত্র কয়েক মাস পরে এ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।
দুই দেশের সরকারই বলছে, তারা জোর করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে না। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রকৃতপক্ষে শরণার্থীরা অংশ নিচ্ছে না। তাহলে আসল ঘটনা কি?
রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার জবাবে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচি তাদেরকে ফেরত নেয়ার বিষয়ে প্রথম কথা বলেন ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময়ে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলো থেকে আকাশে কালো ধোয়া উঠতে দেখা যাচ্ছিল।

রোহিঙ্গাদের জন্য বার্মায় নির্মাধীন ‘বন্দিশিবির” ।

সাধারণ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। বলা হয, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিদের হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার জবাবে তারা এ অভিযান চালাচ্ছে।
২০১৭ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে তিনটি এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গণহত্যা প্রামাণ্য হিসেবে ধারণ করেছি আমি ও আমার সহকর্মীরা। সেখানে নবজাতককে ছুড়ে ফেলা হয়েছে আগুনে। ঘরে, স্কুলে, মাঠের ভিতর এবং বনের ভিতর রোহিঙ্গা নারী ও বালিকাদের পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ করেছে সেনারা। গণহারে আটক করা হয়েছে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও বালকদের। অনেক মানুষ গুম হয়েছেন। রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র দাঙ্গাকারীরা শত শত গ্রাম ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দিয়েছে। এর ফলে কমপক্ষে ৬ লাখ ৮৮ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য হয়েছে।

ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত অবস্থা নয়

১০ই জানুয়ারি। এদিন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী স্বীকার করে, তারা কমপক্ষে ১০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে হত্যা করেছে। এরপর তাদেরকে একটি গণকবরে সমাহিত করেছে। তারপরও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দু’জন সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কাইওয়া সোয়ে ও’কে আটক করেছে। তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা ও অন্যান্য ঘটনার তদন্ত করছিলেন।
আজ পর্যন্ত ধর্ষ, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের জন্য দায়ী একজনও সেনা সদস্য বা কমান্ডারকে জবাবদিহিতার জন্য দাঁড় করানো হয নি। অন্যদিকে জাতিসংঘের সত্য অনুসন্ধানীকারী দল, সাংবাদিক, মানবাধিকার বিষয়ক পর্যবেক্ষকদেরকে ওই রাজ্যে প্রবেশের পূর্ণাঙ্গ অধিকার দিতে একগুঁয়েমির আশ্রয় নিয়েছেন স্টেট কাউন্সেল অং সান সুচি। তিনি তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ অধিকার নিশ্চিত করছেন না।
রাখাইন রাজ্যে এখন ব্যাপকহারে ত্রাণের প্রয়োজন। কিনউত সেখানে ত্রাণ বিতরণকারী সংস্থাকে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। ফলে সেখানে শিশুদের অপুষ্টি ও খাদ্য সংকটের বিষয়ে রিপোর্ট করছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসুচি। তারা বলছে, সেখানে ইমার্জেন্সি লেভেল সৃষ্টি হয়েছে।
এসব বলে, সেখানে ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় নি।
ফলে বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন তারা এক রকম অন্ধকারে। তাদের ভবিষ্যত মেঘাচ্ছন্ন। বুথিডাংয়ের এক রোহিঙ্গা শরণার্থী আমার সহকর্মীদের ও আমাকে নভেম্বরে বলেছেন, আপনারা আমাদেরকে সমুদ্রে ছুড়ে মারতে পারেন। কিন্তু, দয়া করে আমাদেরকে সেখানে ফেরত পাঠাবেন না। আমরা মিয়ানমারে ফিরে যাবো না।
অন্তর্বর্তী শিবির

৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ । মংডুর বাক্কাঘোনায় সৈন্যদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া এক রোহিঙ্গার দেহাবশেষ । এখনো এসব দুঃস্মৃতি ভুলতে পারছেনা শরণার্থীরা ।

রোহিঙ্গাদের আতঙ্ক বোধগম্য। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে ১৯ শে সেপ্টেম্বর অং সান সুচি প্রথম বক্তব্য রাখেন। তখনই তিনি প্রথম রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া নিয়ে কথা বলেন। তিনি ওই সময় ঘোষণা দেন যে, ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ বন্ধ হয়ে গেছে। ভয়ের বিষয় হলো, সুচি অনেকটাই বলে ফেলেছেন। কিন্তু তার দাবি মোটেও সত্য নয়। অন্য যেকারো চেয়ে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় তা ভাল করে জানেন।
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও বিষয়টি ভালভাবে জানে। নভেম্বরে সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে আমার ও আমার সহকর্মীদের একটি মিটিং হয় টেকনাফে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের জেলা সদর দপ্তরের দ্বিতীয় তলার অফিসে। সেটা ছিল উন্মুক্ত পরিবেশ।
সেখানে আমরা এক ঘন্টারও বেশি সময় কথা বলি। এ সময়ে তিনি আমাদেরকে একটি আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। তাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিত্যদিনের কর্মকান্ডের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বাংলাদেশেী সীমান্তের সঙ্গে সীমান্তে এসব কর্মকা- পরিচালনা করে। এতে তাদের কর্মকা-ের তারিখ, সময় উল্লেখ আছে। অং সান সুচি ওই অভিযান বন্ধ হয়েছে, এমন ঘোষণা দেয়ার পরের পুরো দু’মাসের তথ্য এগুলো। মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ওদিকে গুলির বিষয়টি নিশ্চিত করে আমাদেরকে বলা হলো, গত দু’সপ্তাহে সেখানে গোলাগুলি হয়েছে। এটা নিশ্চিত। প্রতি রাতে আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। দেখি গ্রাম জ্বলছে। মৃতদেহও পাওয়া যাচ্ছে।
প্রাণঘাতী সহিংসতার ভীতি ছাড়াও অনেক রোহিঙ্গা আরো একটি আতঙ্কে আছেন। তা হলো তাদেরকে ফেরত পাঠানো হলে রাখা হবে অন্তর্বর্তী ক্যাম্পে।
২০১২ সালের সহিংসতার ফলে বস্তুচ্যুত কমপক্ষে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের আটটি এলাকায় ৩৫টিরও বেশি আশ্রয় শিবিরে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়েছে।

জটিল প্রতিক্রিয়া

মিয়ানমারের বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে উগ্রপন্থি রোহিঙ্গা ‘আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’র (আরসা) আরো হামলা চালানোর আশঙ্কা রয়েছে। যদি এমনটা হয় তাহলে বেসামরিক লোকজনের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর দমনপীড়ন চালানো আরো সহজ হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া সঙ্কটকে জটিল করে তুলেছে।
আগস্ট থেকে আমরা বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষীদের মানবিকতায় সাড়া দেয়ার অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করেছি। এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারাও পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদেরকে খুবই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়েছেন। তাদের এই মানবিক সাদা প্রামাণ্য ও খাঁটি। এমনকি তা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কিন্তু তা যেকোনো সময় পাল্টে যেতে পারতো।
বাংলাদেশের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এক্ষেত্রে তাদের ভুল করার ইতিহাস আছে। তারা জোর করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে যথাযথ নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত না করেই।
১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে একই রকম হামলা চালায়। তখন খাদ্য সহায়তা স্থগিত রেখেছিল বাংলাদেশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমান্তে শরণার্থীদের ওপর শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। বন্দুক তাক করে রাখা হয়েছে।

মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়া
দাতা সরকারগুলোর এই মুহূর্তে উচিত মিয়ানমার সরকারের কাছে দাবি তোলা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে পারেন। মিয়ানমার সরকারের এখন উচিত অন্তর্বর্তী আশ্রয় শিবিরগুলো বাতিল করে দেয়া। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আরোপিত নানা রকম বিধিনিষেধ। বিশেষ করে এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন তাদের মুক্তভাবে চলাচলে বিধিনিষেধ ও পূণাঙ্গা নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনকে ব্যবহার করে বিশ্বকে দেখানোর চেষ্টা করছে যে, তারা সঠিক কাজটিই করছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী যে হায়েনার মতো অপরাধ ঘটিয়েছে তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের এই ফাঁদে পড়া উচিত নয় সরকারগুলোর।
এর পরিবর্তে তাদের উচিত সব রাজনৈতিক উপায় অবলম্বন করে এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

(ম্যাথিউ স্মিথের লেখাটি আজ অনলাইন সিএনএনে প্রকাশিত হয়। এর অনুবাদ এখানে তুলে ধরা হলো।)

সূত্র : মানবজমিন (বাংলাদেশ)

আরো দেখুন

বার্মিজ সেনাপ্রধানের বিচারের দাবি ব্রিটিশ এমপিদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরাকান টিভি :  রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে বার্মার সেনাপ্রধানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি করার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *