Home » প্রবন্ধ » স্থানীয়দের চোখে রোহিঙ্গা জনস্রোত: মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ

স্থানীয়দের চোখে রোহিঙ্গা জনস্রোত: মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ

তানভীর শাতিল (বাংলাদেশ) : 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের ঢল নামে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নির্যাতন-নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশের ভেতরে এসে আশ্রয় খোঁজে আশ্রয়প্রত্যাশী লাখ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে এ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর ঢল নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। সারা জীবন যে জাতিগোষ্ঠী বঞ্চনারই ভাগীদার হয়েছে, তাদের জীবনবোধ আর ‘অসাম্প্রদায়িক’ চেতনা নিয়ে উদ্ভাসিত বাঙালি জাতির জীবনবোধ হয়তো ‘উন্নয়নের’ মানদণ্ডে ভিন্নতা প্রকাশ করবে। কেননা বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভের প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আজ উন্নয়নের মানদণ্ডে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, অন্যদিকে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নিগৃহীত, বঞ্চিত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বেওয়ারিশ’ (নাগরিকত্বহীনতা) বানানোর কূট রাজনীতির প্রেষণে নিষ্পেষিত। কিন্তু ভ্রাতৃত্বের এক অমোঘ সুতোয় বাঁধা মানবতা আবারো হেসে ওঠে ২০১৭ সালে আগস্টের শেষ সপ্তাহে। মানবতার আকুতি পৌঁছে যায় ‘বাঙালি মুসলমানের’ মনে।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ কোনায় মানবতা কাতরে ওঠে, মানবতার করুণ আর্তনাদ পৌঁছে যায় বারুদের মতো বাংলার উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম কোনায়। সাধারণ মানুষ ছুটে যায় যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে মানবতার পাশে তথা নির্যাতিত, নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত অসহায় রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর পাশে। এখানে পুরনো প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা সম্প্রদায় (যারা বিভিন্ন সময়ে ভিটামাটি হারা হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের আশায় এসে, রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন এক জাতি হয়ে ক্যাম্পে বসবাস করছে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে) যেমন এগিয়ে এসেছে, তেমনি এগিয়ে এসেছে স্থানীয় বাংলাদেশীরা; এগিয়ে এসেছে সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়ীসহ নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসার যে রূপ আমার পর্যবেক্ষণে ধরা দেয় তা হলো, ‘কে কীভাবে রোহিঙ্গা সংকটে নিজেদেরকে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত (লাভবান) করতে পারে, তার একটা প্রতিযোগিতা।’ দেশব্যাপী গ্রামীণ তথা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে, ছোট-বড় নেতা সবার একটা দৌড়ঝাঁপ পরিলক্ষিত হয়। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটা মনবাসনা যে এসব মহতীদের ছিল না, তা কিন্তু হলফ করে বলা সম্ভব নয়। মজার ব্যাপার হলো, সবাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বাঙালি মুসলমানের হূদয়ে পাকাপোক্ত করতে যে সুতোয় ধরে ঘুড়ি উড়ান, তা হলো ধর্মের বা সাম্প্রদায়িকতার সুতো। সাম্প্রদায়িকতার কথা এ কারণে বললাম, কেননা ‘বাঙালি মুসলমানের মনে’ মুসলমান ভ্রাতৃত্ব এক অনন্য দ্যোতনা। এ দ্যোতনা মিডিয়া ও নতুন করে যুক্ত হওয়া সোস্যাল মিডিয়ার লাগামহীন ‘ডিসকোর্স’ তৈরির ফাঁদে পড়ে মূলত মানবতা ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ’-এর মোড়কে সামনে আসে। তবে খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, বাঙালি মুসলমানের মনে এ ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ’ অপরার্থে বস্তুত মানবতার ‘মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ’ হয়েই কাজ করেছে। কিন্তু অসার রাজনৈতিক মননবিশিষ্ট এক ধরনের রাজনৈতিক শ্রেণী কোনোভাবেই মানবতার মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধকে পুঁজি করে রাজনীতি করতে সাহস পায়নি। তারা বেছে নিয়েছে একটা ‘আত্মকেন্দ্রিক’, ‘সংকীর্ণ’, ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ’ প্রপঞ্চকে। যদিও দিন শেষে এ মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ কতটুকু প্রভাব বিস্তারে সক্ষম, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। এখানে অবশ্য আরেকটা বিষয় কাজ করেছে তা হলো, রোহিঙ্গাদের মাঝে যে ‘জাতিচৈতন্য’ দেখা যায়, তা মূলত ধর্মভিত্তিক একটা চেতনা, কেননা মিয়ানমারে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বৈষম্য আর বঞ্চনার ধারাবাহিক ইতিহাস অনেকাংশেই এ ধর্মভিত্তিক বিষয়টাকে উসকে দিয়েছে নানা সময়ে। সর্বশেষ তাদের ওপর পরিচালিত নির্মম নির্যাতনের ঘটনা যখন তাদের বয়ানে শুনতে চাওয়া হয় তখন দেখা যায়, তারা স্থানীয় উগ্রপন্থী বৌদ্ধ রাখাইন সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের যে ধর্মভিত্তিক রেষারেষি, সেটাকেই প্রাধান্য দেয়। যদিও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা তাদের আলোচনার নানা বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকে, তবুও এক কথায়, তারা তাদের দুর্গতির জন্য ধর্মভিত্তিক কারণকে সামনে এনে থাকে। তারা বাংলাদেশের মানুষ তথা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আশ্রয় পাওয়ার বিষয়েও মনে করে, মুসলমান রাষ্ট্র তাদের মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গা থেকে আশ্রয় দিয়েছে। মূলত তারা একটা কাল্পনিক একাত্মতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেতে চায়, যা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচনা করলে তাদের এহেন ভাবনার যৌক্তিকতা অবশ্যই থাকে।

তবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার কিন্তু মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়টাকে বিবেচনায় নিয়েছেন, কোনো সংকীর্ণতাকে তারা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আছর করতে দেননি। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মানবতার পাশে দাঁড়িয়ে যে সুনাম ও ‘সহযোগিতা’ অর্জন করেছে, তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি হিসেবে নিশ্চয়ই বিবেচনা করা যেতে পারে। তা নিশ্চয়ই আগামীতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় ‘রাষ্ট্রীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক পুঁজি’ হিসেবে কাজ করবে। তবে এ আশঙ্কাও থেকে যায়, বাংলাদেশ এ সামাজিক পুঁজি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারবে কিনা। তবে এ বিষয়ে সদূরপ্রসারী ও নিবিড় দৃষ্টিপাত প্রয়োজন রয়েছে।

পাশাপাশি স্থানীয় বাংলাদেশী ও আগত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের মিথস্ক্রিয়ায়ও দৃষ্টি নিবন্ধ করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা দ্বয়ের স্থানীয় মানুষের মাঝে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণায়ন এবং বিপরীতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিপ্রেক্ষিত থেকে স্থানীয় বাংলাদেশীদের নিয়ে তাদের ধারণায়ন তুলনা করার মধ্য দিয়ে এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা অনুধাবন করা যায়। দুই সম্প্রদায়ের দিক থেকেই একটা সুপ্ত অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এ সন্তুষ্টি অনেক সময়ই ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের’ কিংবা ‘মানবতাবোধের’ দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।

মানবিকতার মূল্যবোধ কিংবা ‘মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ’ আর ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ’— এ দুটি বিষয়ের মাঝে আদতে যে পার্থক্য আমার কাছে মনে হয় তা হলো, বর্তমান সময়ের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের বিষয়। সে আলোচনায় যাওয়ার আগে, আমি মনে করি, ‘বাঙালি মুসলমান’ কেবল মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গা থেকে রোহিঙ্গা সংকটে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তা মোটেই নয়।

সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবতার পাশে এসে দাঁড়ানোয় পুরো বিষয়ে একটা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের অবিচল আস্থার প্রতীক সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব সবাই অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করেছে, পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের সদস্যরাও স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ভূমিকা রেখেছেন। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নানা মানবতাবাদী সংস্থা কাজ করেছে এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ (নতুন-পুরনো মিলিয়ে) অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোয় সম্পূর্ণরূপে ত্রাণ মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে আছে।

শুধু যে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে স্থানীয় বাংলাদেশীরা রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল, বিষয়টা এত সরলীকরণ করা ঠিক হবে না, অনেক পুরনো রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পের রোহিঙ্গারাও তাদের জ্ঞাতি সম্পর্কের টান থেকে নানাভাবে সহায়তা করেছে। আবার অনেক স্থানীয় বাংলাদেশী ও পুরনো রোহিঙ্গা উভয়েই নতুন আগত রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নিজেদের নানা স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। ফলে এমন একটা মিথস্ক্রিয়ায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতি স্থানীয় বাংলাদেশী মানুষের মাঝে কতটা মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ কাজ করেছে কিংবা অসাম্প্রদায়িক মানবতারই স্থায়িত্ব কতটুকু আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বর্তমান অর্থনৈতিক জামানায় মানবতা মুখ থুবড়ে পড়ে, যখনই নিজস্ব অর্থনৈতিক বলয়ে চাপ পড়ে। স্থানীয় বাংলাদেশীদের যে পরিবেশ, প্রতিবেশ নিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারণ, তার নানা ক্ষেত্রেই বিশাল রোহিঙ্গা স্রোতের করুণ ক্ষত পরিলক্ষিত হয়। এর সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলে কত কোটি বা কত কোটি বিলিয়ন ডলার/ইউরো হবে, কোনো অর্থনীতিবিদের দ্বারাই তা নির্ধারণ সম্ভব না। যে ধরনের ক্ষতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তথা স্থানীয় বাংলাদেশীরা গেছে, তা অন্য পরিসরে আলোচনা হতে পারে। তবে এটুকু বলে রাখি, বস্তুবাদী অর্থনীতিতে বাস্তবতা অনেক ‘বাস্তবধর্মী’, মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা জনস্রোত স্থানীয়দের জীবন আর সম্পদ ব্যবহারের জায়গায় টানাপড়েন তৈরি করেছে, তাদের নানা চাহিদা প্রাপ্যতায় টান পড়েছে। মোদ্দা কথা, মানুষের বেঁচে থাকার ওপর আঘাত মানুষকে মানবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিবেশিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, রিজার্ভ ফরেস্ট, সামাজিক বনায়ন ধ্বংসসহ নানা ক্ষেত্রে যে ক্ষতি সাধন হয়েছে এবং এর ফলে যে মিথস্ক্রিয়া, তার অর্থনৈতিক পরিমাপক কোনো তত্ত্ব আছে কিনা জানা নেই। তবে এ মূর্খতার জায়গা থেকেই আমার কেন জানি মনে হয়, মানুষের অনুভূতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক টানাপড়েনের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যমান এ বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে নেই এবং তা বের করাও দুঃসাধ্য।

বাজারের কথা যেহেতু চলেই এল, রোহিঙ্গা সংকটে ব্যবসায়ী মহলের তত্পরতার দু-একটি উদাহরণ দিয়ে যেতেই হয়। রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয়সংশ্লিষ্ট এলাকা তথা সামগ্রিক ক্যাম্প ও স্থানীয় হাটবাজারকেন্দ্রিক যে নতুন প্রায় ১১ লাখ মানুষের একটা বাজার তৈরি হয়েছে, তা বাজার নিয়ন্ত্রণকারী মহল (ব্যবসায়ীরা) নিজেদের মতো করে দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, এটাই স্বাভাবিক বৈকি! সাধু-অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে আসল-নকল নানা পণ্যের সমারোহ ঘটেছে স্বতঃস্ফূর্ত একটা বাজার বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এ অবস্থাটাকে নৈতিক-অনৈতিকতার তোয়াক্কা না করে, যে ব্যবসায়ী যেভাবে পারে, সেভাবে ব্যবহার করে চলেছে। হয়তো তাদের দৃষ্টিতেও তারা মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছে, মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। আবার অনেক স্বর্ণকার তাদের দোকান খুলে বসেছে, রোহিঙ্গাদের ছোটখাটো গহনা স্বল্প দামে কিনে অধিক মুনাফার আশায়, সেও আসলে তার মতে সেবা দিচ্ছে। বাজারনীতিতে এগুলো অন্যভাবে (মানবিকতার দৃষ্টিতে) দেখার সুযোগ কতটা আছে? এমনও দেখেছি, বাংলাদেশী বিড়ি (তামাকজাত পণ্য) কোম্পানিগুলো তাদের বিড়ির প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে রেখেছে ক্যাম্পের ভেতরের দোকানে দেয়ালে দেয়ালে, বিজ্ঞাপনের ভাষা আবার বার্মিজ, কতটা সৃজনশীলতার (ইনোভেটিভ) পরিচায়ক ভাবা যায়? যেখানে বাংলাদেশের আইনে কোনো ধরনের তামাকজাত পণ্যের প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন আইনত দণ্ডনীয়, এক অর্থে রাষ্ট্রীয় বাজারনৈতিকতা-বিরোধীও বটে। আরেকটু খতিয়ে দেখতে চাইলে দেখা যাবে, এমন নানা অনৈতিকতার ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াচ্ছে বাজারের ফিনিক্স পাখি। যেমন ধরুন, যে ধরনের নকল পণ্যে বাজার সয়লাব হয়েছে কিংবা স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীরা এ অস্থির বাজার পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ভোক্তা অধিকার কিংবা ভোক্তার স্বাস্থ্যের কথা আমলে না নিয়ে অবাধে নকল খাদ্যপণ্যের অসাধু বাণিজ্যবিস্তার ঘটাচ্ছে, তা বৃহদার্থে ‘খাদ্য নিরাপত্তাকেই’ হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য অধিকারের বিবেচনায় স্থানীয় বাজার ও সব মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগতে শুরু করবে আশঙ্কাজনক হারে। এ অবস্থা কেবল রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমনটা নয়, স্থানীয় বাংলাদেশীদের জীবন ব্যয় বৃদ্ধির তালে তালে আয়ও কমেছে নানাভাবে। ফলে সবাই মূলত সস্তা পণ্যের ভোক্তা হতে বাধ্য হচ্ছে, যা মূলত এ অসাধু বাজার বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ‘খাদ্য নিরাপত্তার’ আধুনিক সংজ্ঞায়নের চশমার ফ্রেমে যদি দেখা যায়, তবে খাদ্য ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি নানা বিষয়ের সঙ্গে এ অনিরাপদ খাদ্যপণ্যের বাজারও খাদ্য অনিরাপত্তাকে প্রকট করে তুলছে। ফলে ব্যবসায়ী মহলের সেবা প্রদান কিংবা মানবতার পাশে দাঁড়ানো অনেকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কোনোভাবেই মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ আর মানবিকতার মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধের সঙ্গে ঠিক মিলিয়ে উঠতে পারা যায় না। দেশ বা রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনেক কর্মকাণ্ড নানা চক্রের মাধ্যমে ঘটছে— এমন খবর অহরহই সংবাদ মাধ্যমে আসে। এমনকি ধর্মের নামে এক দল ‘আলেম’ রোহিঙ্গাদের মাঝে ধর্মীয় উন্মাদনার বীজ বপনের পাঁয়তারা করছে— এমন খবরও চোখে পড়ে। তারা মূলত কোনো মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গা থেকে এমন তত্পরতা চালাতে আসে, তা কমবেশি সবারই জানা।

আবার যদি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি কিছু মূলধারার রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দিকে আরোপ করা যায়, তবে নানা বিষয় চোখে পড়বে। অনেকে এ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের অবলীলায় ‘রিফুজি’ বলে সম্বোধন করে বড় বড় ব্যানার ঝুলিয়ে রেখেছে নিজেদের কার্যালয়ের সামনে। যদিও বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকে সতর্কভাবে ‘রিফুজি’ শব্দটা পরিহার করে আসছে। সচেতনভাবে এ শব্দ পরিহার করার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করানোর সূক্ষ্ম রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক বিরাজমান। ফলে ‘রিফুজি’ শব্দ ব্যবহার করা, মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলের সচেতন কিংবা অবচেতন ভুল রাষ্ট্রীয় নৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

ফলে তাবৎ বিষয়াদিকে মনোযোগের জায়গায় রেখে স্থানীয় বাংলাদেশীদের রোহিঙ্গা সংকটে ঝাঁপিয়ে পড়া নিয়ে সমালোচনাপূর্ণ দৃষ্টিতে বলা যায়, ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ আসলে কীভাবে মানবতা ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধকে অনুধাবন করছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সামনের দিনগুলোয়। কিংবা রোহিঙ্গাদের মাঝে ‘ধর্মীয় দোহায়’ কতটা নিবিড়ভাবে গ্রথিত আছে, তাও অনুধাবনের সময় এসেছে। বাংলাদেশে তাদের (রোহিঙ্গাদের) ধর্মাচার পালনের অবাধ স্বাধীনতা কি কখনো সাম্প্রদায়িক চক্রের পাল্লায় পড়ে সাম্প্রদায়িকতায় রূপ নিতে পারে? যা তাদের মানবিক জীবনবোধের যে স্বপ্ন, তা ফিকে করে দিতে পারে, ভাবতে হবে। তারা কি নিজ দেশ ও ভূমি থেকে বিতাড়িত এক জাতিগোষ্ঠী হিসেবে অন্য এক রাষ্ট্রের আশ্রয়ে ক্যাম্পবন্দি, সাহায্য মুখাপেক্ষী হয়ে জীবনযাপন করবে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনিশ্চিত মুখের দিকে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকবে? এসব বিষয়ের সঙ্গে তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সূক্ষ্ম সুতোয় গ্রথিত আছে, যা নিয়ে ভাবার তাগিদ অনুভূত হয়।

তবে আশার বিষয় হলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখনো নিজেদের ‘এথনিক আইডেনটিটি’টুকু বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন বোনে। নিজেদের ভিটামাটির জন্য নীরবে সিক্ত হয় হতাশা আর অনিশ্চয়তার অশ্রুতে। নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বোবা হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের প্রত্যাবাসনে বিশ্বের সব মানবিক মানুষের সহায়তা কামনা করে। এ আলোচনা অন্য এক পরিসরের জন্য রেখে এখানেই শেষ করলাম।

লেখক: উন্নয়ন গবেষক, গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ, ব্র্যাক

facebook comments

আরো দেখুন

বার্মায় ফিরে যাওয়ার আতংকে ভারতে এক রোহিঙ্গার মৃত্যু

নিউজ ডেস্ক, আরাকান টিভিঃ ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের তাঁড়াতে বেশ কিছুদিন ধরে কার্যত্রম শুরু করেছে। এর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *